ঢাকার দ্বিতীয় দ্রুতগতির উড়ালসড়ক ‘ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’র ভৌত কাজ শেষ হয়েছে ৫৮ শতাংশের মতো। নির্মাণাধীন উড়ালসড়কটির কাজের এ পর্যায়ে এসে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের ব্যয় ৯ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি অনুমোদন হলে ৫৫ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়ে প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়াবে ২৭ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা, যেখানে শুরুতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা।
ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন, বাড়তি জমি অধিগ্রহণ, ভ্যাট ও ট্যাক্স বেড়ে যাওয়াকে ব্যয় বাড়ার কারণ হিসেবে দেখিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। যদিও ব্যয় বৃদ্ধির জন্য বাস্তবায়নকারী সংস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করছেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা।
জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) পদ্ধতিতে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণে। ২০১৭ সালে যখন এ প্রকল্প অনুমোদন হয়, তখন নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। তবে ঋণ চুক্তি করতে বিলম্ব হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে দেরিতে কাজ শুরু হয়। এ কারণে প্রকল্পটি সংশোধন করে মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। ৫৮ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়বার প্রকল্পটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। দ্বিতীয় সংশোধনীতে ৫৫ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীতে মেয়াদ ও বরাদ্দ বাড়ার ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে বলা হয়েছে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি। সেখানে বলা হয়েছে ঠিকাদার চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের সঙ্গে প্রকল্পের বাণিজ্যিক চুক্তি অনুযায়ী অনিশ্চিত ঘটনা ব্যতীত নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ডলারের বিপরীতে ৮৬ টাকায়। বর্তমানে প্রতি ডলারের মান প্রায় ১২২ টাকা দাঁড়িয়েছে। এ কারণে অতিরিক্ত ৩ হাজার ৭৩০ কোটি প্রয়োজন।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। উত্তরের সঙ্গে ঢাকার পথ কমিয়ে আনতে এটি বড় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্রকল্পটি যখন নেয়া হয় তখন নকশায় অনেক কিছু বাদ পড়ে যায়। এখন আবারো সেগুলো যুক্ত করতে হচ্ছে। শুরুতেই সবকিছু একত্রে গুছিয়ে না এনে প্রকল্প নেয়া হলে সেটার গতি থাকে না। এখানেও সেটাই হচ্ছে। প্রথমে একবার বরাদ্দ বেড়েছে, এখন আবার বাড়াচ্ছে। এমন ঢিলেমি করলে অনেক সময় বিদেশী ঋণ সংস্থার অর্থসংস্থান দেরি হয়। এখন আবার সংশোধনের জন্য আমাদের কাছে এসেছে বলে শুনেছি। বুধবার মূল্যায়ন কমিটির সভা আছে। সেখানে যাচাই-বাছাই হবে। তারপর আবার ডিপিপি সংশোধনের বিষয় থাকলে ফেরত যাবে। এরপর আবার যখন সেটি সংশোধিত হয়ে আসবে তখন অনুমোদনের বিষয়টা আসবে।’
প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ছাড়াও প্রকল্পের নকশায় পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, নতুন করে কর ও শুল্ক যুক্ত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিদ্যমান ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ পরিকল্পনায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে প্রবেশ ও প্রস্থানে র্যাম্প নির্মাণ, মেট্রোরেল লাইন ১-এর সঙ্গে সংযোগ ও বাইপাইল গ্রেড সেপারেটর ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ অনুষঙ্গগুলো নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে। এ কারণেও ব্যয় বাড়বে।
যদিও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাবটি এখনো অনুমোদিত হয়নি। এটা মূল্যায়ন পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে। আমাদের প্রস্তাবগুলো নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হবে, বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। সবকিছুর পর সরকার যদি মনে করে, আমাদের প্রস্তাব অনুমোদন করা দরকার, অনুমোদন দেবে। অথবা আমাদের প্রস্তাবটি বাতিল করে দেবে। প্রকল্প প্রস্তাব যেহেতু মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে, সেহেতু এ মুহূর্তে এটি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না।’
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে। ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব এ সভায় পর্যালোচনা করার কথা জানিয়েছেন কমিশনের কর্মকর্তারা।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের পরিবহন সমন্বয় উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্পটির সংশোধনী এসেছে। কতটুকু কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে। আর কী প্রস্তাব দিয়েছে সেটি দেখে জানাতে পারব।’
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইন্টারসেকশন থেকে শুরু হয়ে আব্দুল্লাপুর-আশুলিয়া-বাইপাইল দিয়ে ইপিজেড পর্যন্ত অংশে নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। মূল উড়ালসড়কটির দৈর্ঘ্য ২৪ কিলোমিটার। বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে উড়ালসড়কে ওঠানামার জন্য তৈরি করা হবে ১৬টি র্যাম্প বা সংযোগ সড়ক। প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা ও আশুলিয়া-সাভার এলাকার যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখবে এ উড়ালসড়ক। এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে তৈরি করবে আন্তঃদেশীয় সড়ক যোগাযোগের সুযোগ। বিমানবন্দর এলাকায় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সংযুক্ত হবে নির্মাণাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ঢাকা-জামালপুর মহাসড়ক, ঢাকা-মানিকগঞ্জ-তেঁতুলিয়া মহাসড়ক, ঢাকা-মাওয়া-বরিশাল মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে এ প্রকল্প। সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৫৮ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এদিকে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রকল্পটির সমীক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মন্তব্য করেছেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা পুরনো সংস্কৃতি। শুরুতে প্রকল্প গ্রহণের সময় কম খরচ দেখিয়ে কাজকে বাস্তবায়নযোগ্য দেখানো হয়। পরে তা দফায় দফায় বাড়িয়ে নেয়া হয়। সেতু কর্তৃপক্ষ এই পুরনো সংস্কৃতি থেকে যে বের হতে পারেনি, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব। অতীতেও দেখেছি, কাজের অনুষঙ্গ বৃদ্ধি, বাড়তি জমি অধিগ্রহণের মতো গতানুগতিক কিছু কথা বলে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। এ প্রকল্পেও একই ধরনের কথা বলা হচ্ছে। কাজ মাঝ পর্যায়ে আসার পর ব্যয় বৃদ্ধির এ উদ্যোগ প্রকল্পটির সমীক্ষাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।’
অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, ‘সেতু কর্তৃপক্ষ এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তার কাজে অভিজ্ঞতার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’